কালীপূজা কেন করা হয় ? কালীপূজার মাহাত্ম্য ও ইতিহাস।

কালীপূজা কেন করা হয় একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হিসেবে আপনার অবশ্যই জানা প্রয়োজন। কালীপূজার মাহাত্ম্য ও ইতিহাস সম্পর্কে জানলেই আপনি বুঝতে পারবেন কালীপূজা কেন করা হয়। তাহলে চলুন এখন জানা যাক কালীপূজার মাহাত্ম্য ও ইতিহাস এবং কালী পূজা কেন করা হয় হিন্দু সম্প্রদায়ে।
কালীপূজা কেন করা হয় ? কালীপূজার মাহাত্ম্য ও ইতিহাস। হিন্দুধর্ম
কালীপূজা কেন করা হয় ? কালীপূজার মাহাত্ম্য ও ইতিহাস।

সূচিপত্রঃ কালীপূজা কেন করা হয় ? কালীপূজার মাহাত্ম্য ও ইতিহাস।

ভূমিকাঃ
কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে কালী পূজা করা হয়। শক্তির দেবী হিসেবে মা কালীর আরাধনা করে থাকেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। হিন্দু শাস্ত্রমতে যত দেবদেবীর পূজা করা হয় তার মধ্যে কালী পূজা অন্যতম।অনেকে ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার ইচ্ছাতেও নিষ্ঠা সহকারে দেবি কালীর পূজা করে থাকেন।

কালী পূজার আনুষ্ঠানিকতা সাধারণত রাতে হয় এবং বিভিন্ন নিয়মকানুনের মাধ্যমে দেবী কালীর করা হয়। কালী পূজার দিনে আলোকসজ্জা মন্ডপসজ্জা ও আতশবাজির উৎসবের মধ্য দিয়ে বাড়িতে,মন্ডপে এবং মন্দিরগুলিতে সারারাত ব্যাপী কালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

মা কালীর রূপ 

মা কালীর গুন ও কর্ম অনুসারে তার অনেকগুলি রূপ রয়েছে তার মধ্যে হলো: 
মহাকালী, রক্ষাকালী, ভদ্রকালী, দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, গুহ্যকালী, রক্ষাকালী ইত্যাদ। মা কালীর একেক রুপের একেক গুন রয়েছে যা সম্পর্কে জানলে আপনি বুঝতে পারবেন কালী পূজা কেন করা হয়। এছাড়াও মা কালী কে আনন্দময়ী, ভবতারিণী, ব্রহ্মময়ী, করুণাময়ী ইত্যাদি নামেও পূজা করা হয়।
  • দক্ষিণা কালী
দক্ষিণাকালীর বিগ্রহ রূপেই মা কালী সর্বাধিক পরিচিত এবং পূজিত হন। এইরূপে মা চতুর্ভুজা। তার চার হাতে রয়েছে অসুরের ছিন্ন মুণ্ড, খরগ, বর ও অভয় মুদ্রা। মা কালীর গায়ের রং কালো। এছাড়াও তার গলায় নরম মুন্ডের মালা রয়েছে। তার মাথায় আলুলায়িতো চুল এবং মা কালী তার ডান পা ভগবান শিবের বুকে রেখে দন্ডায়মান।
  • শ্মশান কালী
এইরূপে দেবীকে সাধারণত শ্মশানে আরাধনা করা হয়। এইরূপে মায়ের গায়ের রং কাজলের মতো কালো,কেশরাশি আলুলায়িতো এবং চোখ দুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। মায়ের বাম হাতে নরকরোটি নির্মিত পানপাত্র ও ডানহাতে নরমুণ্ড। ডাকাতেরা মূলত প্রাচীনকালে এইরূপে দেবীর আরাধনা করত।

ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে নরবলি দিয়ে মা শ্মশান কালীর পূজা করত। এখনো অধিকাংশ শ্মশানে মা শ্মশানকালীর পূজা হয়ে থাকে। মা কালীর এই রূপে গৃহস্থের বাড়িতে পূজা হয় না। মা কালীর এই রূপের উল্লেখ পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের "দেবী চৌধুরানী" উপন্যাসে।
  • গুহ্যকালী
মা কালীর গুহ্যকালী রূপটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। এইরূপে মা কালী দ্বিভুজা অর্থাৎ দুটি হাত রয়েছে এবং ঘন কালো মেঘের মতো তার গায়ের রং। মাথায় রয়েছে জটা, এই জটার উপর রয়েছে অর্ধচন্দ্র। ৫০টি নরমুণ্ড দিয়ে তৈরি মালা মা গুহ্যকালির গলায় শোভা পায় এবং মায়ের জিহ্বাটি মুখের বাইরে অবস্থান করে।
মায়ের কাঁধে পৈতার মত ঝুলে থাকে সাপ। ফণাতলা সাপের দল মাকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখে। মায়ের দুটি কানে ঝুলে থাকে দুটি শবদেহ। মায়ের বাম কঙ্কনে তক্ষক এবং ডান কঙ্কনে নাগরাজ বিরাজ করে। সাধারণত এইরূপে মাকে সাধক রাই আরাধনা করে থাকে। মা গুহ্য কালীর পূজা গৃহস্থ্য বাড়িতে হয় ।
  • মহাকালী
এইরূপে মা কালীর দশটি মাথা,দশটি হাত এবং দশটি টি পা রয়েছে। দশ হাতে দশটি অস্ত্র থাকে। অসুরের কাটা মুণ্ড মহাকালীর পায়ের নিচে থাকে। সাধকরা ভূত চতুর্দশীর দুপুরে মহাকালীর সাধনা করে থাকে। সাধকরা যখন সাধনা করেন তখন মা এই রূপে তাদেরকে ভয় দেখান। যে সাধক এই ভয়কে জয় করে এক নিষ্ঠায় সাধনা করতে পারেন তাকে মা মহাকালী সৌভাগ্য, রূপ এবং শ্রী প্রদান করেন। গৃহস্থ বাড়িতে এইরূপে মাকে পূজা করা হয় না।
  • ভদ্রকালী 
বিভিন্ন বারোয়ারি পূজা মন্ডপে এইরূপে মাকে পূজা করা হয়। ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময় অর্থাৎ জীবের মরণকালে যিনি মঙ্গল বিধান করেন তিনি ভদ্রকালী। এইরূপে মায়ের গায়ে রং অতসী ফুলের মতন। অর্থ চন্দ্র বিরাজ করে মায়ের কপালে এবং মাথায় জটা থাকে। মা ভদ্রকালীর ষোলটি হাত এবং তার বাহন সিংহ। মার হাতে রয়েছে শূল, শঙ্খ, শক্তি, বাণ, বজ্র, দণ্ড, চর্ম্ম, চক্র, চাপ, পাশ, খেটক, অঙ্কুশ, ঘন্টা, খরগ, পরশু, মুশল। তন্ত্র মতে ভদ্রকালী পাতালের দেবী।
  • রক্ষাকালী 
রক্ষাকালী হলো দক্ষিণা কালীর আরেকটি রূপ। মা কখনো দ্বিভূজা কখনো চতুর্ভূজা। মা রক্ষাকালী মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তার কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণ বর্ণা হয়েছিলেন। মহাদেবের মতো রক্ষাকালীও ত্রিশূলধারিনী ও সর্পযুক্তা। মায়ের গলায় ঝোলে মুন্ডমালা ও নাগহার এবং নয়ন দুটি রক্তবর্ণ। মায়ের বাম পা থাকে শবের বুকে এবং ডান পা থাকে সিংহের পিঠে। এইরূপে সাধারণত গৃহস্থের বাড়িতে মাকে পূজা করা হয়। 

মা কালীর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা  থেকে আশা করি আপনি কালীপূজার মাহাত্ম্য ও ইতিহাস সম্পর্কে একটু হলেও ধারণা পেয়েছেন। 

কালী পূজার আগের কদিন যে কাজগুলো মোটেও করবেন না

  • নেশা করা ঠিক নয়ঃ কালী পূজা বা দীপাবলিতে ধূমপান বা মদ্যপান করার ফলে দেবী লক্ষ্মী রুষ্ট হন। দেবী লক্ষ্মী রুষ্ট হলে আপনার আর্থিক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই কোনরকম নেশা করবেন না দীপাবলির সপ্তাহে।
  • ঘুম থেকে দেরি করে উঠাঃ দীপাবলির সপ্তাহে অবশ্যই আপনাকে সূর্যোদয়ের আগে শয্যাত্যাগ করতে হবে। শাস্ত্রমতে দীপাবলীর সপ্তাহে ঘুম থেকে দেরি করে উঠা একবারেই অনুচিত।

কালীপূজার মাহাত্ম্য 

আমাদের দেশে মা কালীকে নিয়ে যে উৎসবটি ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে সেটি হলো দীপাবলি বা দেওয়ালি উৎসব। যেকোনো উৎসবের চেয়ে এর ব্যাপকতা ও মাদকতা অনেক বেশি কেননা এই উৎসব শহর এবং গ্রাম-গঞ্জে প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে পালিত হয়। দক্ষিণা কালী হলেন দীপান্বিতা অমাবস্যার প্রধান আরাধ্য দেবী।

 মা কালীর রূপ ভীষণ ভয়ঙ্কর কিন্তু তিনি সর্বময়সর্বঙ্গলা সুন্দরী সকল ভক্তের দৃষ্টিতে। এই দিনেই পালিত হয় দীপাবলি উৎসব। দীপাবলির এই আলো শুধু সজ্জা না এর আড়ালে এক জীবন্ত প্রতীক রয়েছে। কালী পূজার মাধ্যমে অশুভ শক্তির ধ্বংস এবং সুখ, শান্তি, স্বাস্থ্য ও সম্পদ প্রাপ্তির জন্য আশীর্বাদ চাওয়া হয়।

কালী পূজার প্রচলন কবে থেকে শুরু 

গ্রন্থ মতে বাংলায় প্রথম কালীমূর্তি বা প্রতিমা পূজার প্রচলন শুরু করেন নবদ্বীপের তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। এর আগে তাম্র পটে বা খোদাই করে কালীমূর্তি এঁকে বিভিন্ন উপাসকরা মা কালীর সাধনা করতে। নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে মা কালীর পূজাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।

আগমবাগীশের পদ্ধতি অনুসারে রামপ্রসাদ সেনও কালী পূজা করতেন। এভাবেই শুরু হয় মা কালীর প্রতিমা পূজা। কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র ও অনেক ধনী জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় উনবিংশ শতাব্দীতে মা কালী পূজার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়।

কালী পূজার পৌরাণিক কাহিনী বা কালী পূজার ইতিহাস

মা কালীর উৎপত্তির পৌরাণিক ব্যাখ্যা এবং মা কালীর আবির্ভাব সম্পর্কে সনাতন ধর্মশাস্ত্রের কালিকা পুরাণের পাতা থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তা হলো পুরাকালে সারা পৃথিবী জুড়ে ভয়ংকর ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল দুইজন ভয়ঙ্কর দৈত্য তাদের নাম হল শুম্ভ এবং নিশুম্ভ। এই দুই দৈত্য দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ান এবং দেবতারা আত্মসমর্পণ করে। দেবতারা দেবলোক হতে বিতাড়িত হন।

দেবরাজ ইন্দ্র আদ্যশক্তি মহামায়া তপস্যা শুরু করেন দেবলোক ফিরে পাওয়ার জন্য। দেবতাদের তপস্যায় দেবী মহামায়া সন্তুষ্ট হন এবং তাদের কাছে আবির্ভূত হন। তখন অন্য একটি দেবীর সৃষ্টি হয় দেবী মহামায়ার শরীর কোষ থেকে যা কৌশিকী নামে ভক্তদের কাছে পরিচিত। মা মহামায়ার দেহ থেকে দেবী কৌশিকী নিঃসৃত হলে কালো বর্ণ ধারণ করে যা দেবী কালীর আদি রূপ বলে ধরা হয়। দেবী কৌশিকী দেবতাদের অভয় প্রদান করেন এবং শুম্ভাসূর ও নিশুম্ভাসূর বধের জন্য রণক্ষেত্রে গমন করেন।

শুম্ভাসূর ও নিশুম্ভাসূরের প্রধান সেনাপতি ছিল রক্তবীজাসূর যে স্বয়ং ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত। ব্রহ্মা তাকে এরকম বর প্রদান করেছিল যে মাটিতে রক্তবীজের এক ফোটা রক্ত পড়লেই জন্ম নিবে একাধিক অসুর। এর ফলে তৈরি হয় ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি যা মোকাবেলা করার জন্য মা দুর্গা তার ভ্রু যুগলের মধ্য থেকে জন্ম দেন প্রলয়কারী দেবী কালীকার। 

এ সময় মা কালী ভয়ংকর রুদ্র রূপ ধারণ করে একের পর এক অসুরকে বধ করতে থাকেন। যাতে পুনরায় অসুর জন্মাতে না পারে এই জন্য দেবী অসুরের শরীর থেকে বিন্দু পরিমাণ রক্ত ক্ষরণ হলেও সেই রক্ত লেহন করতে থাকেন জিভ দিয়ে।

সর্বশেষে রক্তবীজকে বধ করে সমস্ত রক্ত পান করেন মা কালী। এভাবে মা বিভিন্ন রূপে বারংবার ধ্বংস করেন অশুরদের। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে অমাবস্যার গভীর রাত্রে মন্ত্র উচ্চারণ এর মাধ্যমে কালী পূজা করা হয়। প্রাচীনকালে পশুর রক্ত বা পশু বলি করে দেবীকে উৎসর্গ করে দেবীকে সন্তুষ্ট করা হতো। এছাড়াও লুচি,মিষ্টি এবং নানা ফল ভোগ দেওয়া হয় প্রসাদ হিসেবে।

কালী পূজা কেন করা উচিত 

আমরা ষড়ঋপুর নাম তো শুনেছি। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই ষড়ঋপু বিরাজ করে। ষড়ঋপু হল কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মায়া এবং মৎসর্য। আমাদের খারাপ পথে নিয়ে যায় এই ষড়ঋপু। আদ্যশক্তি মা কালীর পূজার মাধ্যমে আমরা আমাদের ভেতরের ষড়ঋপুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। 

কালীপূজার মাধ্যমে আমরা মনের অন্ধকার দূর করতে পারি এবং সমাজকে আলোর পথে নিয়ে যেতে পারি। অসামাজিক কাজকর্ম এবং সমাজের সকল খারাপ বা অসৎ কাজকর্ম নির্মূল করার জন্য শক্তির আরাধনা স্বরূপঃ মা কালী পূজা ভক্তি সহকারে এবং শ্রদ্ধা সহকারে করব। এখান থেকে নিশ্চয় বুঝতে পারলেন কালীপূজা কেন করা হয়।

শেষ কথা

মা কালী হলেন শক্তির দেবী। তিনি যুগে যুগে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। মা কালীর রুদ্ররূপ অনেক ভয়ংকর। তিনি কখনো করুনাময়ী রূপে তার ভক্তকে রক্ষা করেছেন এবং কখনো ভয়ংকর রুদ্ররূপে অসুরদের বধ করেছেন। মায়ের পূজার মাধ্যমে শুধু আমার মায়ের কৃপায় লাভ করি তা না আমরা আমাদের মনের অশুভ শক্তিকেও ধ্বংস করি। 

এই সমাজকে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা এবং সমাজকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য অবশ্যই আমরা মা কালীর পূজা করবো। একজন ব্যক্তি কালী পূজার মাহাত্ম্য ও ইতিহাস সম্পর্কে জানলে অবশ্যই সে বুঝতে পারবে কালীপূজা কেন করা হয়।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

জানবো আমরা ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url